আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে সবচেয়ে বেশি লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে ব্যাংক খাত নিয়ে। বেসিক ব্যাংক ও হলমার্ক কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে এস আলম গ্রুপের লুটপাট এবং সালমান এফ রহমানের ঋণ জালিয়াতি। সব মিলিয়ে এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে কমপক্ষে ৩ লাখ কোটি টাকা লুটের অভিযোগের তথ্য রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে। এসব ঘটনায় দেড় শতাধিক মামলা করেছে সংস্থাটি। দুদক সচিব জানান, লুট হওয়া অর্থের বড় অংশই পাচার করেছেন আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগীরা।
গণঅভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকার দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ করে। এতে ১৪ বছরে ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের তথ্য উঠে আসে। ওই হিসাব অনুসারে প্রতিবছর গড়ে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে।
এ নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে দুদক জানায়, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অর্থ পাচারের বড় অংশই হয়েছে ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত নাম এস আলম গ্রুপ। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে একের পর এক ব্যাংক দখলের পর ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটের অভিযোগ রয়েছে গ্রুপটির বিরুদ্ধে।
দুদকে জমা হওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, চারটি ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা সরিয়েছে এস আলম গ্রুপ।
এছাড়া শেখ হাসিনার সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে শুধু জনতা ব্যাংক থেকেই ৩৫ হাজার কোটি টাকাসহ পুরো ব্যাংক খাত থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা লুটের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে দুদক।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে শত শত বাড়ির মালিক সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি। ইউসিবি ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ৩০টি মামলা হয়েছে।
এবার একটু পেছনে ফিরে দেখলে সামনে আসে আলোচিত অর্থ পাচারকারী প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পিকে হালদারের নামও। ভারতে গ্রেফতার থাকা এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক এ ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগের তথ্য রয়েছে দুদকের কাছে।
এছাড়া সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি এবং হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা লুটের অভিযোগ রয়েছে। সিকদার গ্রুপ, নাসা গ্রুপ ও নাবিল গ্রুপসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক লুটপাটের অভিযোগও খতিয়ে দেখছে দুদক। এসব ঘটনায় সমন্বিতভাবে কাজ করছে যৌথ টাস্কফোর্স।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সচিব সাইদুর রহমান খান বলেন, পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা সরকারের অগ্রাধিকার কর্মসূচির একটি। এ লক্ষ্যেই সরকার একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে এবং দেশের আইন, বিধিবিধান ও নীতিমালা উপেক্ষা করে এসব অর্থ পাচার করা হয়েছে। এ কারণেই একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে সরিয়ে নেয়া সম্ভব হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, লুটপাটের অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করতে সরকারের সব সংস্থাকে আন্তরিকতার সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
অর্থনীতি বিশ্লেষক মাজেদুল হক বলেন, পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদের কারণে বিশ্বজুড়ে বাজারে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। আবার এসব অর্থ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডেও ব্যবহৃত হয়। বিষয়টি সামনে রেখে বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়ানো। এর মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনা যেতে পারে।
সাবেক জেলা জজ ড. শাহজাহান সাজু বলেন, গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রদূতদের ভূমিকা রয়েছে। এ জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তা না হলে অর্থ পাচারকারী ও দণ্ডিত আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।
পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছে দুদকসহ যৌথ টাস্কফোর্স ৩০টি চিঠি পাঠানোর কথা জানা গেছে।

