বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়গুলোতে নতুন ধরণের অনেক মিডিয়া আউটলেট গড়ে উঠছে। নতুন ধরণের আইডিয়া, গেটাপ-সেটাপ সব মিলিয়ে এই মিডিয়াগুলো দর্শকদের নজর কাড়ছে। আবার অনেক নতুন গণমাধ্যম আবার নিউমিডিয়াকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।
এই নতুন ধারার গণমাধ্যমের গতিপ্রকৃতি ও দর্শকপ্রিয়তা বুঝতে কন্ঠ মিডিয়া সাম্প্রতিক সময়ের ছয়টি আলোচিত মিডিয়া আউটলেটের ২৬ মে বিকাল তিনটা পর্যন্ত আপলোড হওয়া পঞ্চাশটি ভিডিওর ফেসবুকে পাওয়া ভিউ বিশ্লেষণ করেছে। এই ছয় মিডিয়া হল: দ্য পোস্ট, আলাপ, চরচা, ঢাকা স্ট্রিম, আগামীর সময় এবং ঢাকা পেপার্স। এই কনটেন্ট হাবগুলোর অনেকেই একাধিক পেইজ থেকে অপারেশন পরিচালনা করে থাকলেও কন্ঠ মিডিয়া কেবল মাদার ফেসবুক পেইজের তথ্য থেকেই তুলনামূলক বিশ্লেষণটি তৈরি করেছে।

এই বিশ্লেষণ স্পষ্ট ভাবে ইঙ্গিত দে- এদেশের ডিজিটাল মাধ্যমের দর্শক এখন শুধু সুপ্রতিষ্ঠিত বড় ব্র্যান্ডের নামের ওপর নির্ভর করছেন না, বরং গবেষণানির্ভর তথ্য এবং মানসম্পন্ন কনটেন্টকেও বিপুলভাবে গ্রহণ করছেন। এটি একই সাথে যেমন প্রতিটি মাধ্যমের নিজস্ব শক্তির জায়গাগুলোকে ফুটিয়ে তুলেছে, তেমনই মেধার জোরে নতুনদের সামনে আসার এক অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছে।
ডিজিটাল মাধ্যমের এই বিকাশমান বাজারে নিজস্ব একনিষ্ঠ দর্শকশ্রেণী তৈরি করা দীর্ঘদিনের সাধনা ও ধারাবাহিকতার ফসল।
এই ল্যান্ডস্কেপে সুপ্রতিষ্ঠিত মাধ্যমগুলো তাদের শক্তিশালী ব্র্যান্ড ভ্যালু নিয়ে এক অটল অবস্থানে রয়েছে। যেমন, প্রায় ১৮ লাখ ফলোয়ারের এক সুবিশাল অডিয়েন্স বেস নিয়ে এই বাজারে বড় একটি ভিত্তি তৈরি করেছে অতি সম্প্রতি বাজারে আসা আগামীর সময়। দারুণ কাগজের পত্রিকার পাশাপাশি তার নিউমিডিয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছে সমানতালে। তাদের শেষ পঞ্চাশটি ভিডিওর মোট দর্শক সংখ্যা ১ লাখ ১৫ হাজার ৩৩৩। বোঝা যাচ্ছে নতুন হলেও একটি নির্দিষ্ট দর্শকগোষ্ঠী নিয়মিত তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও ঐতিহ্যবাহী কনটেন্টের ওপর গভীর আস্থা রাখছেন। এতো বড় পেজের নিজস্ব সামাজিক ও করপোরেট গ্রহণযোগ্যতা থাকে, যা নতুনদের জন্য অন্যতম বড় অনুপ্রেরণা।

সমকালীন নিউমিডিয়ার দুই প্রধান এবং মজবুত স্তম্ভ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছে দ্য পোস্ট এবং আলাপ। ৬ লাখ ১৪ হাজার ফলোয়ার সমৃদ্ধ দ্য পোস্টের শেষ পঞ্চাশ ভিডিওতে এসেছেন ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৬০ দর্শক এবং ৪ লাখ ৯৬ হাজার ফলোয়ার নিয়ে আলাপের ৩ লাখ ৩৭ হাজার ৩০০ দর্শক প্রমাণ করে যে, বুদ্ধিদীপ্ত, সচেতন ও গভীর বিশ্লেষণধর্মী কনটেন্ট দেখার জন্য তারা লাখ লাখ মানুষের প্রথম পছন্দের ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। ফলোয়ার সংখ্যার সাথে ভিউয়ের এই চমৎকার ও ইতিবাচক ভারসাম্য তাদের কনটেন্টের প্রতি দর্শকদের গভীর নির্ভরযোগ্যতারই প্রমাণ।
এই বড় ব্র্যান্ডগুলোর পাশাপাশি মধ্যম সারির অন্য প্ল্যাটফর্মগুলোও বেশ দ্রুতগতিতে এবং নিজস্ব ঢঙে নিজেদের পরিধি বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষ করে ২ লাখ ৭ হাজার ফলোয়ার নিয়ে চর্চা নামক প্ল্যাটফর্মটির শেষ পঞ্চাশ ভিডিওতে পাওয়া মোট দর্শক সংখ্যা ১ লাখ ৯০ হাজার ৫০৬, যা অত্যন্ত আশাব্যাঞ্জক। এটি পরিষ্কার ইঙ্গিত দেয় যে, তাদের কনটেন্ট নির্বাচন ও আধুনিক উপস্থাপনা শৈলী নতুন প্রজন্মের তরুণ দর্শকদের বেশ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে ২ লাখ ৮৮ হাজার ফলোয়ার সমৃদ্ধ গণমাধ্যম ঢাকা স্ট্রিম তাদের মাদার পেইজ থেকে শেষ পঞ্চাশটি ভিডিওতে ৯০ হাজার ৫০৯ ভিউ পেয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট ঘরানার দর্শকদের মাঝে একটি নিয়মিত এবং পজিটিভ উপস্থিতি বজায় রেখেছে।
সবাই যখন নিজেদের ট্র্যাক রেকর্ড ও সুদৃঢ় অবস্থান অনুযায়ী চমৎকার পারফর্ম করছেন, ঠিক তখনই সমস্ত প্রথাগত সমীকরণ ও ডিজিটাল ধারণাকে ছাড়িয়ে এক অভূতপূর্ব জোয়ার সৃষ্টি করেছে একেবারেই নতুন আসা গণমাধ্যম ঢাকা পেপার্স। ফলোয়ার সংখ্যার বিচারে তারা এই তালিকায় সবচেয়ে নতুন এবং তরুণ ঢাকা পেপার্সের ফলোয়ার সংখ্যা মাত্র ৪৮ হাজার। কিন্তু পারফরম্যান্সের মূল মাঠে তারা যা দেখিয়েছে, তা ডিজিটাল মিডিয়ার ইতিহাসে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তাদের শেষ পঞ্চাশটি ভিডিওর দর্শক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৬৮ হাজার ৩৫২-তে। এই সাফল্যের গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন তালিকায় থাকা বাকি প্রতিষ্ঠিত ও সম্ভাবনাময় মাধ্যমগুলোর সাথে এর একটি সরাসরি তুলনামূলক সমীকরণ মেলানো হয়। পেজের আকারের দিক থেকে এই বাজারের সবচেয়ে বড় পরাশক্তি হিসেবে পরিচিত আগামীর সময়, যাদের অনুসারীর সংখ্যা ঢাকা পেপার্সের চেয়ে প্রায় সাঁইত্রিশ গুণ বেশি। অথচ ভিউয়ের মাঠে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র; মাত্র ৪৮ হাজার অনুসারী নিয়ে ঢাকা পেপার্স যে পৌনে নয় লাখ ভিউয়ের মাইলফলক ছুঁয়েছে, তা আগামীর সময়ের মোট ভিউয়ের চেয়ে সাড়ে সাত গুণেরও বেশি। এই সমীকরণটি প্রমাণ করে যে, ডিজিটাল দুনিয়ায় সুনির্দিষ্ট ও বড় অডিয়েন্স বেস থাকা যেমন একটি স্বস্তিদায়ক প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি, তেমনই কনটেন্টের তীব্র কার্যকারিতা দিয়ে সেই বিশাল অনুসারীর বৃত্তকে অনায়াসে ছাড়িয়ে যাওয়াও সম্ভব।
সমকালীন নিউমিডিয়ার দুই প্রধান স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত দ্য পোস্ট এবং আলাপের সাথে তুলনা করলেও ঢাকা পেপার্সের এই অর্গানিক জোয়ার চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। ৫ থেকে ৬ লাখ ফলোয়ারের বিশাল পরিধি এবং বাজারে অত্যন্ত মজবুত অবস্থান নিয়ে দ্য পোস্ট এবং আলাপ যৌথভাবে যে পরিমাণ দর্শকপ্রিয়তা ধরে রেখেছে, তাদের সেই সম্মিলিত ভিউয়ের যোগফলও ঢাকা পেপার্সের একার অর্জনের চেয়ে প্রায় দেড় লাখ কম।
এমনকি আমরা যদি এই বাজারের অন্য চার মাধ্যম— আলাপ, চর্চা, আগামীর সময় এবং ঢাকা স্ট্রিমের শেষ পঞ্চাশটি ভিডিওর মোট ভিউকে একসাথে যোগ করি, তাহলেও সেই সম্মিলিত সংখ্যাটি ঢাকা পেপার্সের একার ভিউ সংখ্যাকে স্পর্শ করতে পারে না। মাঝারি সারির দুই সম্ভাবনাময় মাধ্যম চর্চা এবং ঢাকা স্ট্রিমের সম্মিলিত ভিউয়ের চেয়েও ঢাকা পেপার্স একাই প্রায় ৬ লাখ ভিউ বেশি জেনারেট করেছে। এই তুলনামূলক বিশ্লেষণ পরিষ্কার করে যে, বর্তমান ডিজিটাল ল্যান্ডস্কেপে দর্শককে স্ক্রিনের সামনে ধরে রাখার জাদুকরী দক্ষতায় ঢাকা পেপার্স এই মুহূর্তে বাজারে এক অনন্য ও একচ্ছত্র বেঞ্চমার্ক তৈরি করেছে।
এই পারফরম্যান্স নতুনদের জন্য আশার। এটা ইঙ্গিত করছে ডিজিটাল মিডিয়ায় গভীর প্রভাব তৈরি করার জন্য এখন আর কেবল মিলিয়ন ফলোয়ারের বিশাল পেজের প্রয়োজন নেই; কনটেন্টে ধার থাকলে ছোট পেজও পুরো মার্কেট লিড করতে পারে।
ঢাকা পেপার্সের এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে এক নিখুঁত ও আধুনিক কনটেন্ট স্ট্র্যাটেজি, যা বাকিদের জন্যও একটি দারুণ গাইডলাইন হতে পারে। তারা প্রতিটি জটিল ও সংবেদনশীল বিষয়কে যেভাবে গভীর ডেটা, চার্ট এবং যৌক্তিক বিশ্লেষণ দিয়ে সাধারণের ভাষায় উপস্থাপন করছে, এইসব কনটেন্ট দর্শকদের ভিডিওর শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত স্ক্রিনে ধরে রাখছে।
ফেসবুক বা ইউটিউবের আধুনিক অ্যালগরিদম ডিজাইন করা হয়েছে ওয়াচ টাইম এবং অডিয়েন্স রিটেনশনের ওপর ভিত্তি করে। ঢাকা পেপার্সের ভিডিওগুলোর দর্শক ধরে রাখার ক্ষমতা এত বেশি যে, প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম একে নিজে থেকেই লাখ লাখ নতুন দর্শকের অর্গানিক টাইমলাইনে পুশ করছে, যার ফলে পেজের সীমানা ছাড়িয়ে এক বিশাল দর্শকগোষ্ঠী তাদের সাথে যুক্ত হচ্ছে।
দিনশেষে এই স্বাস্থ্যকর ও মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের নিউমিডিয়ার বাজারকে আরও সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করে তুলবে। হাজারো চটকদার ও ভাইরাল কনটেন্টের ভিড়ে এই ছয় গণমাধ্যমের সাফল্য প্রমাণ করেছে ভাইরালিজম নয়- কনটেন্টের গভীরতাই হবে সামনের দিনের সফলতার আসল চাবিকাঠি।

