সপ্তাহ সেরা

আরও পড়ুন

অকৃতজ্ঞতা ও অরণ্যের অন্তকথা

অরণ্য নিধনের ইতিহাস মূলত মানব সভ্যতার বিকাশ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং তথাকথিত অর্থনৈতিক অগ্রগতির এক দীর্ঘ ও ধারাবাহিক উপন্যাস। আদিম যুগে মানুষ যখন শিকারী জীবন ছেড়ে কৃষিকাজে অভ্যস্ত হতে শুরু করলো, ঠিক তখন থেকেই পৃথিবীর বুকে বন উজাড়ের প্রথম সূচনা হয়। 

নব্যপ্রস্তর যুগে আগুন জ্বালিয়ে এবং পাথরের কুঠার দিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করে চাষাবাদ ও স্থায়ী বসতি গড়ে তোলার মাধ্যমেই প্রকৃতির সবুজ চাদরে তৈরি করা হয়েছিল প্রথম ক্ষত । 

তবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং নিয়মতান্ত্রিক ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয় শিল্প বিপ্লবের পর থেকে। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায় কলকারখানা স্থাপন, রেললাইন নির্মাণ, জাহাজের কাঠ সরবরাহ এবং কয়লা খনির জন্য ব্যাপক হারে বনাঞ্চল ধ্বংস করা হয়। ঔপনিবেশিক শাসনামলে এই ধ্বংসের থাবা ছড়িয়ে পড়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার ক্রান্তীয় অঞ্চলে। 

ব্রিটিশ শাসকেরা ভারতীয় উপমহাদেশে রেললাইনের স্লিপার তৈরি এবং নীল চায়ের মতো বাণিজ্যিক ফসলের চাষাবাদের জন্য লাখ লাখ একর প্রাচীন অরণ্য নিমিষেই ধূলিসাৎ করে দেয়। বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে এসে এই অরণ্য নিধন এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। আধুনিক যুগে এসে আমাজন, কঙ্গো অববাহিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রেইনফরেস্টগুলো উজাড় হচ্ছে মূলত গবাদি পশুর চারণভূমি তৈরি, সয়াবিন চাষ, পাম অয়েল উৎপাদন এবং কাঠ ও কাগজের মণ্ড তৈরির মতো বাণিজ্যিক লোভে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে এ পর্যন্ত পৃথিবীর মোট বনাঞ্চলের প্রায় অর্ধেকাংশ কেটে ফেলা হয়েছে। 

আজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের যুগে চেইন-স এবং বুলডোজারের মতো আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে মাত্র কয়েক মিনিটে এক একটি বিশাল অরণ্যকে মরুভূমিতে পরিণত করা হচ্ছে চরম অমানবিকতার সাথে। প্রকৃতির এই নির্মম বিনাশ কেবল গাছের মৃত্যু নয়, বরং এটি পৃথিবীর জলবায়ুর ভারসাম্য নষ্ট করছে, ধ্বংস করছে জীববৈচিত্র্য এবং মানবজাতিকে  নিমজ্জিত করছে চিরতরে এক মহাবিপর্যয়ের কালকূপে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত