প্রায় ৬০০০ বছর আগের কথা ! আমরা বর্তমানে পারফিউম-এর যে ধরনের ভ্যারিয়েশন ব্যবহার করি তা তখনও উদ্ভাবিত হয়নি । তখন পারফিউম ছিল সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের ঊর্ধ্বে । হ্যাঁ, প্রায় ৬০০০ বছর আগের কথা বলছি , প্রাচীন মেসোপটেমিয়া ও মিশরেই শুরু হয়েছিল পারফিউমের পথচলা । ল্যাটিন শব্দ ‘Per’ অর্থ: মধ্য দিয়ে এবং ‘Fumum’ অর্থ: ধোঁয়া । অর্থাৎ, পারফিউম শব্দের মূল অর্থ ‘ধোঁয়ার মাধ্যমে প্রাপ্ত সুগন্ধ’। তৎকালীন মেসোপটেমিয়া ও মিশরের অধিবাসীরা স্রষ্টা-কে সন্তুষ্ট ও মুগ্ধ করার জন্য তৈরি করতেন এই সুগন্ধি ধোঁয়া । অর্থাৎ, তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাস থেকেই সৃষ্টি হয়েছিল প্রথম পারফিউম। বিভিন্ন ধরনের কাঠ, ফুল ও বিশেষ ধরনের রজন পুড়িয়ে উৎপন্ন করা হতো এই সুগন্ধি ধোঁয়া । দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রেকর্ডকৃত পারফিউম তৈরি হয় খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ অব্দে । তপতি (Tapputi) নামে মেসোপটেমিয়ার একজন বিখ্যাত নারী রসায়নবিদ তেলের সাথে বিভিন্ন ধরনের ফুল এবং গাছপালা মিশিয়ে তৈরি করেন এই মুগ্ধতা ছড়ানো সুগন্ধি । প্রাচীন মিশরে পারফিউমকে ডেভেলপ করা হয় উল্লেখযোগ্যহারে । পারফিউমের সাথে মিশরবাসীর সখ্যতা ছিল বর্ণনাতীত । মমী সংরক্ষণের সময়েও তাঁরা ব্যবহার করতেন এই সুগন্ধি । মিশরীয় রানি সেবা এবং ক্লিওপেট্রা বিখ্যাত ছিলেন সুগন্ধি ব্যবহারের জন্য । পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাচীনতম সুগন্ধি তৈরির কারখানা ছিল সাইপ্রাস-এ । অর্থাৎ, সেই সময় বৃহৎ পরিসরে পারফিউম তৈরি হতো প্রাচীন সাইপ্রাসে । একই সময়ে সিন্ধু সভ্যতাতেও সুগন্ধি ব্যবহার হতো বলে প্রমান পাওয়া যায় ।পারফিউম-এ বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে বিখ্যাত বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও চিকিৎসক ইবনে সিনা’র উদ্ভাবনের মাধ্যমে । বিজ্ঞানী ইবনে সিনা পারস্যে তাঁর কর্মজীবনের সময়কালে গোলাপ থেকে নির্যাস বের করার জন্য ‘ডিস্টিলেশন’ বা পাতন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন । ফলে তরল পারফিউম এবং গোলাপ জলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায় উল্লেখযোগ্যহারে এবং পারস্য সুগন্ধের স্পর্শ ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বমাঝে । ইউরোপে পারফিউমের বিকাশ হয় ১৪শ শতকে রেনেসাঁ যুগে । সে সময় হাঙ্গেরির রাণী এলিজাবেথের জন্য প্রথম অ্যালকোহল ভিত্তিক পারফিউম তৈরি করা হয় । ‘হাঙ্গেরি ওয়াটার’ নামে এই পারফিউম ছিল রাজপরিবারের আভিজাত্যের পরিচায়াক । পরবর্তী ব্যাপক পরিবর্তন আসে ১৬শ শতকে । তখন ইতালিতে পারফিউম তৈরির শৈলী ও কৌশল উন্নত হয় প্রশংসনীয়হারে ।আধুনিক পারফিউমের পরিধিতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখে ফ্রান্স । একারনেই ফ্রান্সকে বলা হয় আধুনিক পারফিউমের কেন্দ্রবিন্দু । রাজা চতুর্দশ লুই-এর সময় এই ব্যাপ্ততা আরও ছড়িয়ে পড়ে । তাঁর রাজসভাকে ‘সুগন্ধি রাজসভা’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছিল । ফ্রান্সের গ্রাস (Grasse) শহর ছিল উৎকৃষ্ট পারফিউম তৈরির অঞ্চল এবং বর্তমানে এই শহরটি “পারফিউম রাজধানী” হিসেবে সারাবিশ্বে পরিচিত ।রসায়ন শাত্রের উন্নতির ফলে ১৯ শতকের শেষভাগে তৈরি হয় সিনথেটিক পারফিউম । এসময় রসায়নবিদগণ কৃত্রিমভাবে সুগন্ধি অণু তৈরি করতে শিখলেন । এসময় রসায়নবিদগণ কৃত্রিমভাবে সুগন্ধি অণু তৈরি করতে শিখলেন । ফলে পারফিউম জগতে এল চমৎকার পরিবর্তন । বর্তমানে ‘Headspace Technology’ নামক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন দুর্লভ ফুল এবং অন্যান্য সুগন্ধযুক্ত দ্রব্যের সুগন্ধ নষ্ট না করেই তাঁদের রাসায়নিক গঠন নকল করা হচ্ছে । ফলে প্রকৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করেই তাঁর সৌরভ নেওয়ার সুযোগ হচ্ছে আমাদের । সুগন্ধ সমৃদ্ধ করে মন এবং আভিজাত্যকে । পুনঃ পুনঃ আরও সমৃদ্ধ হোক পারফিউমের পথচলা, সমৃদ্ধ হোক আমাদের আবেগ আর আভিজাত্য ।


