নতুন রাজনৈতিক দল তৈরির সংকট ও সম্ভাবনা | Kontho

নতুন রাজনৈতিক দল তৈরির সংকট ও সম্ভাবনা

নতুন রাজনৈতিক দল তৈরির সংকট ও সম্ভাবনা

৫ই আগস্ট-পরবর্তী সময়ে নানা রকম সংকট, স্বার্থ এবং বিদ্বেষের আবর্তে জুলাইয়ের যে অপ্রতিরোধ্য জাতীয় শক্তি তৈরি হয়েছিল, তা শুধু ভেঙে গেছে বললেই কম বলা হবে; বরং এখানে যে শক্তিশালী সম্ভাবনা গড়ে উঠতে পারত, তাকে প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। আর এতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলো, যারা এই শক্তিকে মাথা তুলে দাঁড়াতেই দেয়নি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে একাত্তরের পরেও বহু রাজনৈতিক উদ্যোগ ও দল এসেছে, কিন্তু বৃহৎ দলগুলোর রাজনৈতিক চাল এবং ছোট দলগুলোর রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা ও পরিকল্পনার অভাবে সেগুলো কখনোই প্রধান শক্তিতে রূপ নিতে পারেনি। ফলে জুলাইয়ের শক্তিও আজ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খণ্ডে বিভক্ত। অনেকেই নানান সংগঠন বা দল গড়ে তুললেও ফোকাসে আসলেও তা টিকছে না; কারণ তারা প্রভাব বিস্তার এবং নিজেদের শক্তিশালী করার ভুল ও সংকীর্ণ প্রক্রিয়ার ওপর ভর করে এগোতে চেয়েছে।

এর বড় একটি উদাহরণ হতে পারে গণঅধিকার পরিষদ। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের মতো প্রথাগত দলগুলোর চরিত্র মানুষ যখন প্রত্যাখ্যান করতে শুরু করেছিল, তখন তরুণ ও যুবকদের হাত ধরে গণঅধিকার পরিষদ গঠনের মধ্য দিয়ে একাত্তর-পরবর্তী সময়ে একটি বড় আশার আলো জ্বলে উঠেছিল। কিন্তু হাতেগোনা কিছু অথর্বদের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা ও অজ্ঞতার কারণে আমরা সেখানে সফল হতে পারিনি। ৫ আগস্টের পর অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যারা যুক্ত হয়েছিল এবং যারা রাজনীতিকে ঘৃণা করা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের পরিবর্তনের তাড়নায় রাজপথে নেমেছিল, আজ তারা কোথায়? বিদেশ থেকে অনেকেই দেশ পুনর্গঠনের জন্য ফিরে আসার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন, কিন্তু জুলাইয়ের শক্তি হিসেবে নিজেদের একক দাবিদারদের ( এনসিপি) আধিপত্য এবং ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর সদিচ্ছার অভাবে সেই সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রটি নষ্ট হয়ে গেছে।

গণঅধিকার পরিষদ ভেঙে যাওয়ার পর অনেকে নানা নামে ও দলে ছড়িয়ে পড়ে। গনঅভ্যুত্থানের পরে গনঅভ্যুত্থানের প্রধান শক্তি মনে করে অনেকেই এনসিপিতে যোগ দিলেও সেখানেও একই পুরনো রাজনৈতিক চরিত্র ও কোন্দল প্রতীয়মান হয়েছে। ফলস্বরূপ, যারা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে ভাবত এবং সক্রিয় ছিল, সেই বিশাল অংশটি বাধ্য হয়ে ঘরে ফিরে গেছে। এর মানে এই নয় যে তাদের রাষ্ট্র পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা মরে গেছে; সেই স্পৃহা আজও তাদের ভেতরে বেঁচে আছে বলে আমি বিশ্বাস করি। তারা বিশ্বাসযোগ্য কোনো প্ল্যাটফর্ম বা রাজনৈতিক দল না পাওয়ায় যুক্ত হতে পারছে না।

বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় গনঅধিকার পরিষদ এবং এনসিপি কোনোটারই আপাতদৃষ্টিতে সফল হবার সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করছি৷ পাশাপাশি পুরাতন রাজনৈতিক দল গুলো কোনো ভাবে সম্ভাবনা তৈরি করতে পারবে না৷ সে গুলো বনসাই হয়ে গিয়েছে৷ বিএনপি বা জামায়াত তাদের গতানুগতিক ধারার বাহিরে আসতে পারেনি৷ ছোট দল গুলোর প্রধান নেতাদের চিন্তা শুধুই এমপি হওয়া আর ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষার তাড়না৷ এদিকে নতুনরা সব ফাঁকিও ধরে ফেলছে৷ এখনো যারা আফিমে বুদ হয়ে আছে, তারাও সময়ের পরিক্রমায় বুঝতে পারবে৷

৫ আগস্টের পরে যে পরিমাণ সংগঠন ও রাজনৈতিক দল গজিয়ে উঠেছে, তাদের দলীয় কালচার সাধারণ মানুষ পছন্দ করছে না। এসব দলের বেশিরভাগের পেছনে আছে জামাত, যা অনেকেই বলতে চায়৷ দল তো চাইলেই গড়া যায়, কিন্তু তাকে সারা দেশের গণমানুষের দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রয়োজন আদর্শ, দূরদর্শী সিদ্ধান্ত, সঠিক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সবার আগে জনগণের আস্থার জায়গা তৈরি করা। গণঅভ্যুত্থান হঠাৎ করে হয়নি; পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পরেই তা সম্ভব হয়েছে। ঠিক তেমনি, অতীত ও বর্তমানে নিজেদের বা অন্যের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে সঠিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও পরিবেশ তৈরি করেই কেবল এগোতে হবে।

আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রাজনীতির কোনো বালাই বা উপস্থিতি নেই বললেই চলে। এই অনুপস্থিত ও শূন্যতার পরিস্থিতিতে হুট করে একটা দল ঘোষণা করলেই রাতারাতি কিছু হবে না। যারা নিজেদের উদ্যামী, সৎ এবং বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যোগ্য মনে করেন, তাদের সবাইকে প্রথমে কিছু মৌলিক বিষয়ে একমত হতে হবে। সবার আগে বুঝতে হবে আমরা কেন রাজনীতি করি এবং রাজনৈতিক দলের কাজ কী। রাজনীতি মানে কেবল একতরফা ত্যাগ নয়, এটি মূলত নিজের ও অন্যের পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সহমর্মিতার মেলবন্ধন। মানুষ নানা বৈচিত্র্যময় পরিবেশ, পরিবার ও সমাজ থেকে আসে; তাদের চিন্তাভাবনা, ভাষা, খাদ্যাভ্যাস সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে। এই ভিন্ন চরিত্রের মানুষকে একত্রিত করে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে নির্দিষ্ট কিছু পয়েন্টে ঐকমত্য থাকতেই হবে, যার ব্যত্যয় ঘটলেই সংকট অনিবার্য। একই সাথে থাকতে হবে গভীর আত্মোপলব্ধি। নিজের গোষ্ঠী, চেনাজানা বৃত্ত বা তোষামোদকারী লোক দিয়ে দল সাজানোর পুরনো সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতেই হবে; যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিতে হবে৷ অন্যথায় এই উদ্যোগও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। আমরা আর কোনো ব্যর্থতা দেখতে চাই না।

তাই এই মুহূর্তে নির্বাচনী দল গড়ার সময় নয়। এখন সময় হলো একত্রিত হওয়া, দেশ ও মানুষের কল্যাণে বিভিন্ন পলিসি নিয়ে কাজ করা, সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া, তাদের সঠিক পলিসি গ্রহণে বাধ্য করা এবং মাঠে নিজেদের দুর্দান্ত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন করা। যে সমর্থক হওয়ার যোগ্য, তাকে সমর্থক হিসেবেই রাখতে হবে; আর কর্মী তার কাজের মাধ্যমেই নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে জায়গা করে নেবে। আমাদের রাজনীতির সবচেয়ে বড় অভিশাপ হলো কোরামবাজি ও ভাইগিরি কালচার, যা যোগ্য মানুষকে তার উপযুক্ত স্থানে বসতে দেয় না। রাষ্ট্রে ৩০০ জন সংসদ সদস্য থাকলেই তারা প্রকৃত জনপ্রতিনিধি হন না, যদি না তাদের পেছনে জনগণের সমর্থন থাকে। একজন নেতাকে নিজের শক্তি বাড়াতে হলে আরও দশজন যোগ্য নেতা তৈরি করার মানসিকতা রাখতে হবে, যারা রাষ্ট্রের জন্য কাজ করবে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, তাড়াহুড়ো করে দল না বানিয়ে, সততা, দৃঢ়তা ও ঐক্যের সাথে আগামী দুই বছর ধরে যদি মাঠপর্যায়ে মানুষের কল্যাণে কাজ চালিয়ে যাওয়া যায়, তবে পরিস্থিতির উপরে নির্ভর করে, সঠিক সময়ে সফল রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাব ঘটবে।

শামীম রেজা
লেখক, রাজনৈতিক গবেষক,
প্রধান সংগঠক, সার্বভৌমত্ব আন্দোলন।