রাজনৈতিক জ্যেষ্ঠতা, দল ও রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্যতা

রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ‘সিনিয়র’ বা জ্যেষ্ঠতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরা মূলত তাঁদের দীর্ঘ জীবন, সংগ্রাম এবং বাস্তবতার মধ্য দিয়েই অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা অর্জন করেন। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এ বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের সংকীর্ণতা তৈরি হয়েছে। অনেকের ধারণা, বড় কোনো পদাধিকার পাওয়া, সভা-সমাবেশে চটকদার ও বড় বড় বুলি আওড়ানো কিংবা টেলিভিশন মিডিয়ার টকশোতে এলোমেলো ও অসংলগ্ন কথা বললেই কেউ বিরাট রাজনীতিবিদ বা রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেন। অথচ প্রকৃত জ্যেষ্ঠতা ও অভিজ্ঞতার মানদণ্ড সম্পূর্ণ আলাদা এবং এর পরিধি অনেক বেশি বিস্তৃত।

রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ পদবিন্যাসের হিসাব-নিকাশ আর একটি স্বাধীন-সার্বভৌম সরকারের বিন্যাস এক নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা বলতে নিছক বয়সের জ্যেষ্ঠতা বা দলীয় পদকে বোঝায় না। জ্যেষ্ঠতা মানে হলো সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পারদর্শিতা, গভীর জ্ঞান ও কর্মদক্ষতা। একজন ব্যক্তি যদি আধুনিক অর্থনীতি, জটিল বাজার ব্যবস্থাপনা কিংবা দেশের আইনকানুন ও নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলো সম্পর্কে সম্যক ধারণা না রাখেন, তবে তিনি কীভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় বা রাষ্ট্রীয় বিভাগ সফলভাবে পরিচালনা করবেন? তবে বিষয়টি এমন নয় যে, তাঁকে সব বিষয়ে পরিপূর্ণ অভিজ্ঞ হতে হবে। তাঁর সার্বিক বিষয়ে ধারণা ও বিচক্ষণতা থাকতেই হবে, যার মাধ্যমে তিনি অভিজ্ঞ মানুষদের নিয়ে তা পরিচালনা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করতে পারবেন।

বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, যখন কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে নীতিনির্ধারণী বা মন্ত্রণালয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনার প্রয়োজন হয়, তখন নিয়মানুযায়ী দলের সেই বিষয়ের সংশ্লিষ্ট সম্পাদকীয় পর্ষদ বা বিশেষজ্ঞদের সেখানে যাওয়ার কথা। কিন্তু এর বিপরীতে প্রায়ই দেখা যায়, দলের নির্দিষ্ট চার-পাঁচজন পদধারী নেতাই সব জায়গায় দাপ্তরিক বা রাজনৈতিক কার্যক্রমে ঘুরে বেড়ান এবং কোনো ধরনের পড়াশোনা ও জ্ঞান ছাড়াই সব বিষয়ে কথা বলেন। এর ফলে দলের ভেতরে এক ধরনের অসন্তোষ, অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। আর এই বিশৃঙ্খলার কারণে অনেক সম্ভাবনাময় ও মেধাবী মানুষ পিছিয়ে যান বা দল ছেড়ে দেন।

জনপ্রতিনিধি বা সংসদ সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে তৃণমূল থেকে উঠে আসা পরীক্ষিত, ত্যাগী এবং জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত পরিচিত ও যোগ্য মানুষগুলোকে মূল্যায়ন করা সবচেয়ে বেশি জরুরি। কারণ মাটির কাছাকাছি না থাকলে সাধারণ মানুষের বাস্তব চাওয়া ও চাহিদা অনুধাবন করা যায় না। তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, রাষ্ট্রের জটিল ও বৃহত্তর প্রয়োজনে কিছু পারদর্শী ও দূরদর্শী ব্যক্তিত্ব রাজনৈতিক দলে থাকেন, যাঁদের উপদেষ্টা মণ্ডলীর মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রাখা উচিত। সেখান থেকেই অভিজ্ঞ লোকজনকে মন্ত্রিসভায় বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যুক্ত করা প্রয়োজন।

পাশাপাশি আমাদের এই বিষয়টিও গভীরভাবে খেয়াল রাখতে হবে যে, মন্ত্রী বা নীতিনির্ধারক হিসেবে যাঁরাই দায়িত্ব পালন করবেন, সংশ্লিষ্ট কাজে তাঁদের পর্যাপ্ত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতা থাকতে হবে। এছাড়া তাঁদের সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ পরামর্শ দেওয়ার মতো আরও অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ দলের ভেতর বা বাইরে সক্রিয় থাকা আবশ্যক। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা মূলত দেশ ও জনগণের কল্যাণে যুগোপযোগী পলিসি বা নীতিমালা তৈরি করেন। কিন্তু গতানুগতিক ধারার রাজনীতিতে প্রায়শই পুঁজিপতি ও ব্যবসায়ীদের মনোনয়ন দেওয়া হয়, যাঁদের সঙ্গে সাধারণ মাটি ও মানুষের কোনো আত্মিক যোগাযোগ বা স্পর্শ থাকে না।
পুঁজিপতিরা রাজনীতি ও তৃণমূলে জনবিচ্ছিন্ন থাকে। যেহেতু এই শ্রেণির প্রতিনিধিরা বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে দলীয় মনোনয়ন কেনেন এবং নির্বাচন বৈতরণী পার হন, তাই তাঁরা রাজনীতি ও জনপ্রতিনিধিত্বকেও একটি ব্যবসায়িক বিনিয়োগ হিসেবেই গণ্য করেন। তাঁরা মনে করেন, নির্বাচনে খরচ করা অর্থ বা পুঁজি তাঁরা লাভসহ ফিরিয়ে নেবেন। সাধারণ জনগণের কল্যাণ বা রাষ্ট্রীয় সংস্কারের চেয়ে তাঁদের কাছে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত রিটার্ন পাওয়ার বিষয়টিই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্র ও রাজনীতির এই অসুস্থ, বাণিজ্যভিত্তিক ধারা থেকে আমাদের অবিলম্বে বেরিয়ে আসতে হবে। মেধাহীন ও জনবিচ্ছিন্ন এই চর্চা টিকিয়ে রাখলে রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

পরিশেষে বলা যায়, রাজনৈতিক অঙ্গনে জ্যেষ্ঠতা বা সিনিয়র মানেই হলো অর্জিত অভিজ্ঞতা, বিচক্ষণতা ও পারদর্শিতা। সেখানে রাজপথের আন্দোলন, স্লোগান, লৌকিক জনপ্রিয়তা বা কেবল পদপদবি অত্যন্ত গৌণ বিষয়। রাষ্ট্রকে সত্যিকারের জনকল্যাণমুখী, আধুনিক ও কার্যকর একটি কাঠামোতে দাঁড় করাতে হলে পদ-পদবির মোহ কাটিয়ে যোগ্যতা, মেধা এবং অভিজ্ঞতার এই মূল্যায়নকেই সবার আগে প্রাধান্য দিতে হবে। তবেই দেশ ও জাতির কাঙ্ক্ষিত মুক্তি ও সমৃদ্ধি অর্জিত হওয়া সম্ভব। আর তাতে করে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন দেশপ্রেমিক মানুষেরা দেশ ও জনতার কল্যাণে রাজনীতিতে আসবে, কারণ তারা চায় সম্মান ও যথাযথ মূল্যায়ন।

শামীম রেজা
লেখক রাজনৈতিক গবেষক, প্রধান সংগঠক
সার্বভৌমত্ব আন্দোলন