লাল রঙের দৃষ্টিনন্দন এক সুবিশাল ‘ডাক বাক্স’। বাইরে থেকে স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন মনে হলেও, ভবনটি নিয়ে উঠেছে কোটি কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ। পাঁচ বছরের নির্মাণ প্রকল্পে পিডি পরিবর্তন হয় তিনবার। নকশা পরিবর্তন আর কৃত্রিম সংকটের দোহাই দিয়ে ৫৫ কোটি টাকার ভবনটির নির্মাণ ব্যয় দাঁড়ায় ৯২ কোটিতে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ডাক বিভাগের সদর দফতর। লাল ডাক বাক্সের আদলে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন ভবনটিতে বাইরের স্থাপত্যে আধুনিকতার ছাপ থাকলেও, প্রকল্পের নথি, অর্থ ব্যয় এবং ভবনটির ব্যবহার নিয়ে উঠেছে একাধিক প্রশ্ন।
সরকারের প্রকল্প বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই ভবনটি নির্মাণের শুরুতে প্রকল্পে পরিকল্পনা ছিল ৮ তলা পর্যন্ত তৈরির। তবে, প্রকল্পের শেষ মুহূর্তে এসে নকশা ও পরিধিতে পরিবর্তন এনে ১৪ তলা ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। সঙ্গে প্রকল্প ব্যয়ও ৩৭ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯২ কোটি টাকা। এছাড়া, বাস্তবায়নের সময়ও বাড়ে।
কিন্তু যে উদ্দেশ্যে বিপুল অর্থ ব্যয়ে ভবনটি নির্মাণ তার বাস্তব ব্যবহার কতটা হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ভবনের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, উদ্বোধনের পাঁচ বছরেও চালু করা যায়নি নিচতলার ডে-কেয়ার সেন্টার ও ক্যান্টিন। দ্বিতীয় তলার সেমিনার রুমেও হয় না কোনো কার্যক্রম। সময় সংবাদের উপস্থিতির পর, সেখানে শুরু হয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ।
কম্পিউটার ল্যাবের কার্যক্রমও প্রায় বন্ধ। আর পাশের বড় একটি কক্ষ যেটি অফিস স্পেস হিসেবে ব্যবহারের কথা, সেই জায়গা রীতিমত স্টোরে পরিণত। দেখা যায় মনিটরের কার্টন ও অসংখ্য বস্তা।
তৃতীয় তলার লাইব্রেরিও সাক্ষী দিচ্ছে অযত্ন আর অবহেলার। পাশেই অন্ধকার ও ফাঁকা পড়ে আছে পোস্টাল মিউজিয়ামের জন্য নির্ধারিত কক্ষ। শুধু একটি ফ্লোর নয়। ভবনের বিভিন্ন তলার চিত্রও প্রায় একই। বড় পরিসরের পরিবর্তে সীমিত সংখ্যক কক্ষ ব্যবহৃত হচ্ছে।
১৪ তলা এই ভবন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯২ কোটি টাকা। কিন্তু ভবনের বিভিন্ন অংশের ব্যবহার, অব্যবহৃত স্পেস এবং নির্মাণের পর দেয়ালে ফাটলের চিহ্ন; সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে ভবনটি নিয়ে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালনা বিধিমালার ১৬ এর ৩৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের আগে প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। অথচ প্রকল্পের প্রায় পাঁচ বছরে কাজ করেছেন তিনজন প্রকল্প পরিচালক। তৃতীয় প্রকল্প পরিচালক মো. রিয়াজুল ইসলামের দায়িত্বকাল নিয়েও নথিতে উঠে এসেছে একাধিক আর্থিক প্রশ্ন।
নথি অনুযায়ী, তার প্রায় ২৬ মাসের দায়িত্বকালে ৮০ কোটি টাকার বেশি অর্থ ছাড় করা হয়। এর মধ্যে, ২০১৯ সালের ৩০ জুন একদিনেই প্রায় পৌনে ৭ কোটি টাকার বিল পাস ও অগ্রিম অর্থ প্রদানের তথ্য রয়েছে।
রাজস্ব চালানের প্রায় আড়াই কোটি টাকার নথিতে অসঙ্গতি। এমনকি অডিট নথিতেও উঠে আসে আপত্তির বিষয়টি।
অভিযোগ ও অডিট আপত্তির বিষয়গুলো নিষ্পত্তির আগেই ২০২৪ সালে অবসরে যান তৎকালীন পিডি রিয়াজুল ইসলাম। অবসরে গেলেই অনিয়মের বিষয়ে জবাবদিহির প্রশ্ন শেষ হয়ে যায় না; বলছেন দুর্নীতিবিরোধী সংস্থার প্রতিনিধিরা।
এ বিষয়ে জানতে বার বার চেষ্টার পরও কোনো বক্তব্য দেননি ডাকের কর্মকর্তারা। দৃষ্টিনন্দন ভবনটির আড়ালে থাকা অনিয়ম নিয়ে তদন্ত হবে, নাকি সমীক্ষা রিপোর্টেই সীমাবদ্ধ থাকবে সেটিই দেখার বিষয়।
